উত্তর চট্টগ্রামের এক সময়ের ত্রাস, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফজলুল হক ওরফে ফজল হক দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর নতুন পরিচয়ে দেশে ফিরে আবারও সক্রিয় হয়েছেন—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, পুরনো সহযোগীদের সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত করে তিনি একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। বালি উত্তোলন, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাসপোর্টে নাম বদলে বিদেশে অবস্থান
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ফজল হক নিজের পরিচয় গোপন করতে পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে ‘মফিজুল রহমান’ নামে (পাসপোর্ট নং: EM0766483) দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থান করেন। সেখানে তার বাবার নাম উল্লেখ করা হয় আব্দুস সালাম এবং মায়ের নাম রাবেয়া বেগম। ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়—১৩ নং নোয়াপাড়া ইউনিয়ন, ৪ নং ওয়ার্ড, জহির বাড়ি, গুহ পাড়া।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি গোপনে দেশে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম পরিবর্তনের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলাফেরা করছেন বলেও জানা গেছে।
একাধিক হত্যা মামলার আসামি
৮০ ও ৯০-এর দশকে উত্তর চট্টগ্রামে ত্রাস সৃষ্টি করা ফজল হকের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। রাউজান, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও কোতোয়ালী থানায় তার বিরুদ্ধে বহু মামলা বিচারাধীন। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। তার আগেই পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে বিদেশে পাড়ি জমান বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরাধ সাম্রাজ্যের সূচনা ও বিস্তার
৯০-এর দশকের শুরু থেকেই নোয়াপাড়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন ফজল হক। ২০০০ সালের দিকে পুলিশি নথিতে তাকে ‘দুর্ধর্ষ’ সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ফজল হক বাহিনী’ এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ত্রাস সৃষ্টি করে। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে নোয়াপাড়া থেকে এই বাহিনীর চারজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এছাড়া গশ্চির নোয়া হাটে ইকবাল জামিল হত্যাকাণ্ড, দিদার মার্কেট ও কামাল বাজারের স্বর্ণের দোকান ডাকাতিসহ বড় বড় অপরাধেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
দেশে ফিরে নতুন করে সক্রিয়তা
দেশে ফেরার পর আবারও পুরনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছেন ফজল হক—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অনুসারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
সম্প্রতি ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম হত্যাকাণ্ডে ফজল হকের ক্যাডারদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বিকেলে মুদনাঘাট সেতু পার হয়ে হাটহাজারী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত আবদুল হাকিম বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন বলে জানা গেছে।
এর আগে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তিকে জুমার নামাজে যাওয়ার পথে একই কায়দায় হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের সদস্য গ্রেপ্তার
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর অভিযানে ফজল হকের ছোট ভাই জানে আলম গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
শুধু তাই নয়, ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে যদি জানে আলমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের মহড়ায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাকে উত্তর জেলা কমিটির পদ থেকে বহিষ্কার করা হবে।
রাউজানে মৃত্যুর মিছিল
গত ৮ মাসে রাউজানে ধারাবাহিক সহিংসতায় নিহতদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন— আবদুল মান্নান মিয়া, ইউসুফ মিয়া, মাওলানা আবু তাহের, আজম খান, নুর উদ্দিন বকুল, মোহাম্মদ জাফর, জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ হাসান, কমর উদ্দিন জিতু, মোহাম্মদ রুবেল, মানিক আবদুল্লাহ ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যদি ভিন্ন পরিচয়ে দেশে ফিরে এসে পুনরায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি।
স্থানীয়দের দাবি—দ্রুত তদন্ত করে তার অবস্থান শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হোক, নতুবা রাউজানে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
| ফজর | ৪:০৯ - ৫:২৮ ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১১:৫৯ - ৪:৩১ দুপুর |
| আছর | ৪:৩২ - ৬:২৫ বিকাল |
| মাগরিব | ৬:২৭ - ৭:৪৫ সন্ধ্যা |
| এশা | ৭:৪৬ - ৪:০৮ রাত |
| জুম্মা | ১.৪০ মিনিট দুপুর |